[bangla_day] [english_date] [bangla_date]
ই-পেপার   [bangla_day] [english_date]

সেবা বঞ্চিত ৬ লাখ মানুষ
প্রকাশ: 2 December, 2018, 4:48 am |
অনলাইন সংস্করণ

সেবা বঞ্চিত ৬ লাখ মানুষ
শরীয়তপুর প্রতিনিধি।।

পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত শরীয়তপুরের চরাঞ্চলে প্রায় ৬ লাখ মানুষ অপ্রতুল ব্যবস্থাপনার কারণে সব ধরনের সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনো রকমে জানমাল নিয়ে বেঁচে আছে চরাঞ্চলের এসব অসহায় মানুষ। তারা সরকারের তেমন কোনো সেবা পাচ্ছে না। চিকিৎসাসেবা, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, ইপিআই কার্যক্রম, কৃষিসেবা এমনকি কোথায় কোথায় প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শত শত শিশু মৌলিক অধিকার শিক্ষাসহ সব ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার বার আবেদন করা হয়েছে। তেমন কোনো ফল আসেনি। গোসাইরহাট উপজেলার মাঝের চর গ্রামের হাতেম আলী মিয়া জানান, দেশের সর্ববৃহৎ দুটি নদী পদ্মা ও মেঘনা ঘিরে রেখেছে পুরো শরীয়তপুর জেলাকে। মূল ভূখণ্ড ছাড়াও এ জেলায় ছোট বড় প্রায় ২০টি চর রয়েছে। এর মধ্যে জাজিরা উপজেলার কুণ্ডেরচর ও পালেরচর, নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা, নওয়াপাড়া, ঘড়িষারের একাংশ। ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া, দক্ষিণ তারাবুনিয়া, কাঁচিকাটা, চরভাগা। গোসাইরহাট উপজেলার মাঝেরচর, চরজানপুর, উত্তর জানপুর, চরজালালপুর, কুচাইপট্টি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এসব চরাঞ্চলে প্রায় ৬ লাখ মানুষের বসবাস, যা জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। মূল ভূখণ্ড থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ চরগুলোতে চলাচলের একমাত্র বাহন ট্রলার বা নৌকা। চর থেকে মূল ভূখণ্ডে আসতে বা যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। সেখানে কোনো সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা পৌঁছায়নি। কোনো চিকিৎসাসেবার সুযোগ না থাকায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীদের সহসাই উদ্ধার বা চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় অসুস্থ মানুষটিকে। সরকারিভাবে শিশুদের বিশেষ করে ৬টি টিকা দেওয়া হয়। চরের শিশুরা এ টিকা থেকেও বঞ্চিত। কারণ সেখানে কোনো ইপিআই কার্যক্রম নেই বললেই চলে। চরাঞ্চলের সক্ষম দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত। দিন দিন বেড়ে চলেছে এই অঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। এ এলাকায় পরিবার পরিকল্পনার কোনো কার্যক্রম নেই। সরকারিভাবে এখনো কোনো পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছায়নি, নেই কোনো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বা এর উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে চারবাসীর নেই ন্যূনতম কোনো ধারণা। বিশেষ করে গোসাইরহাট উপজেলার মাঝেরচর ও চরজানপুর এ দুটি চরের প্রায় দুই হাজার শিশুর লেখাপড়ার জন্য কোনোরকম সরকারি উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করা হয়নি। আছে একটিমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুর্গম এ চরাঞ্চলের কোথাও ছিল না একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস) নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগে মাঝের চরে তিনটি উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করে। পরবর্তীকালে এসডিএস তিনটি বিদ্যালয়ের একটি বিদ্যালয়কে আবুল হাসেম নামকরণ করে রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে আবুল হাসেম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে সরকারি অনুমোদন পায়। পাশাপাশি এসডিএস আলাদাভাবে এসডিএস একাডেমি-২ নামে একটি ফরমাল প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু রাখে। সেখানে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সখ্যা ২২৬ জন। ৫ জন শিক্ষক দিয়ে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানে বেসরকারি সংস্থা এসডিএসই  শিক্ষকদের ভাতা ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করছে। জেলার গোসাইরহাট উপজেলার মাঝেরচরে প্রায় ৪০০ পরিবার রয়েছে যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ শিশু তাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এ চরে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এছাড়া চরজানপুরেও শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কৃষিপ্রধান এ দেশে এখানে নেই কোনো কৃষি অফিস বা কৃষি কর্মকর্তা। ফলে কৃষক কৃষি বিষয়ে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। মাঝের চর গ্রামটি কিছুটা উঁচু হলেও চরজানপুর গ্রামটি একেবারেই নিচু। পুরো চরের কোথাও একটু শুকনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী কয়েক হাজার মানুষের চোখে-মুখে শুধু ভয় আর হতাশা। নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার মতো তাদের নেই কোনো অবলম্বন। দোচালা খড় বা শণের তৈরি ঘরেই বসবাস বেশিরভাগ মানুষের। বন্যা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর মতো তাদের কোনো আশ্রয় নেই। সরকারিভাবে এখনো নেওয়া হয়নি কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ। প্রতিটি মুহূর্তে এ দুটি চরের মানুষ থাকে মারাত্মক দুর্যোগ ঝুঁকিতে। উপজেলা সদর থেকে দুই আড়াই ঘণ্টার নৌ যোগাযোগ ছাড়া ওই চরে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারিভাবে এখনো কোনো স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায়নি। চরবাসীর প্রায় সবাই পেশায় প্রান্তিক চাষি, জেলে ও নৌকার মাঝি। চরাঞ্চলের মানুষের দাবি, সরকার জরুরিভিত্তিতে এ বিষয়ে নজর দেবে।

সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে মাঝের চরের বাসিন্দা জহু খালাসী (৫৪ ) জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে এই চরে বসবাস করছি। আমাদের কোনো আয়-রোজগার নেই, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসা করতে পারি না, ঝড়-তুফানের মধ্যে আল্লাহরে ডাকা ছাড়া কোনো পথ থাকে না। আমরা চাই সরকার আমাদের জন্য স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করুক।

মনোয়ারা বেগম (৪৮) বলেন, আমরা পোলা মাইয়াগের লেখাপড়া করাইতে পারি না, অসুস্থ হইলে ডাক্তার পাই না। আমাদের চাইতে পশুপাখিও বেশি সুবিধা পাইয়া বাঁইচ্চা আছে। চরজানপুর গ্রামের শিক্ষার্থী এমরান হোসেন, তাহমিনা, রাশেদা ও টিপু মিয়াসহ অনেকেই খুব আবেগঘন, ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, সারা চরে শুধু পানি আর পানি, এক দেড় মাইল দূর থেকে সাঁতরাইয়া স্কুলে আসি, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের একটা নৌকাও নাই, একটা পোশাক পইরা সাঁতরাইয়া আসি আরেকটা শুকনা পোশাক সাথে নিয়ে আসি। শুকনা পোশাক পরে ক্লাস করে আবার ভিজা পোশাক পরে বাড়িতে যাই। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, সরকার যেন আমাদের জন্য পাকা স্কুলঘর এবং রাস্তা নির্মাণ করে দেন। গোসাইর হাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের চরজানপুর চরের শামীম বেপারী বলেন, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস আইলেই আমাগের অন্তর শুধু ডরে কাঁপতে থাকে, আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেইকা কার্তিকের শেষ পর্যন্ত বাঁচি শুধু লড়াই কইরা। বছরের আষ্ট মাসই কাটে ঝড়, তুফান, বন্যা আর পানির অত্যাচার সইতে সইতে। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা আমরা পাই না।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, যখন সুযোগ ছিল তখন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি বেসরকারিভাবে বিদ্যালয় করে দিতে চায়, আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।

গোসাইরহাট উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ নাসির উদ্দিন বলেন, আমার উপজেলার এ দুটি চরের মানুষ নদীভাঙাসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবকিছু হারিয়ে এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এখানেও তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে। এখানে একটি বেসরকারীি ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের জন্য দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

Spread the love




সর্বশেষ সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদসমূহ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদকঃ দেলওয়ার হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ এস এম মোশারফ হোসেন মিন্টু
বার্তা সম্পাদকঃ
 
মোবাইল- 01711102472
 
Design & Developed by
  কলাপাড়ায় বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মানকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের উপর হামলা,অর্ধশত গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা।।   “পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকে আমরা পরিবহন সেবা দিতে চাই” নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী   পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মঙ্গলবার ৪টি আনলোডার মেশিন যুক্ত হয়েছে।। ৬৩ ভাগ কাজ সম্পন্ন   ঘুরে দাঁড়িয়েছে বন্দর   কলাপাড়ায় জমি অধিগ্রহন না করার দাবিতে কৃষক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংবাদ সম্মেলন   ‘পায়রা সমুদ্র বন্দর বানিজ্য সম্ভাবনার নতুন দরজা”-পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্সের শ্লোগান   পায়রা বন্দরে ২০২১ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে ২২ হাজার কোটির টাকার মধ্য মেয়াদী প্রকল্প   নতুন পায়রা সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ